নিজস্ব প্রতিনিধি
নিরাপদ ট্রেন পরিচালনা, ট্রেনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ এবং রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য কাজ করে রেলওয়ের সংকেত ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। এই বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীগন নতুন রেল লাইন, সিগন্যাল আপগ্রেডেশন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, ইলেকট্রনিক ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ পরিচালনা করে, এটি রেলওয়ের অপারেশনাল সেফটি ও যোগাযোগের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
কিন্তু—এই বিভাগের প্রকল্প সমূহে কেনাকাটা ও রক্ষণাবেক্ষণে ঘাপটি মেরে থাকা প্রকৌশলীদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে লুট করা হচ্ছে সরকারের কোটি কোটি টাকা। বিশেষ করে অতি: প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী (সিএসটিই-পূর্ব) তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার প্রায় ৮ বছর ধরে এই বিভাগের দায়িত্বে থেকে কমিশন বাণিজ্য, ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম-দুর্নীতি করে যাচ্ছেন দেদার এমন অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, জুন ২০১৯ থেকে ২০২১ সিএসটিই-পূর্ব, এবং ফেব্রুয়ারী ২০২১ থেকে ২০২২ মার্চ পর্যন্ত ডিআরএম-চট্টগ্রামের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি, ডিআরএম থাকা অবস্থায়ও ১৩ টা ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বে ছিলেন, এই ১৩ ডিপার্টমেন্টে করেছেন তিনি হরিলুট, সাপ্লায়ার/ঠিকাদারদের সঙ্গে আতাত করে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। এদিকে এপ্রিল ২০২২ থেকে পুনরায় অতি: সিএসটিই পূর্বের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংকেত এবং টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রকল্পের অর্থ ছাড়করণ ও ঠিকাদারদের বিল দেওয়ার তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে প্রধান সংকেত এবং টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রকৌশলী সুশীল কুমার হালদারকে। এ বিষয়ে দুদক বরাবর এই বিভাগের সকল কাজের তথ্য প্রদান করেছেন বলেও জানান প্রশৌশলী তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার।
জানা যায়, গত একযুগে রেলের উন্নয়নে খরচ হয়েছে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার মত। রেলে বিনিয়োগে অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেলেও সংকেত ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে মাত্র সামান্য। অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই চালানো হচ্ছে ট্রেন। এতে ঘটছে বড় দুর্ঘটনা। ডিজিটাল যুগে এসব অ্যানালগ সিগন্যাল (সংকেত) পদ্ধতি একেবারেই অকার্যকর বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলেন, এই বিভাগে শত শত কোটি টাকার বাজেট কাজের নামে সংঘবদ্ধ চক্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ট্রেন দুর্ঘটনায়, দায় ছিল সিগন্যাল (সংকেত) ব্যবস্থার। দায় ছিল এই বিভাগের দায়িত্বপালনকারী প্রকৌশলীদের।
জানা গেছে, এই দপ্তরের নিদিষ্ট ঠিকাদার ছাড়া কেউ কাজ পায় না, বছরের পর বছর এরাই কাজ করেন সিএসটিই’তে। যার কারণে দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ও সংঘবদ্ধ ঠিকাদার সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজে করা হচ্ছে রমরমা হরিলুট। যা দেখার কেউ নেই?
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান গুলো হলো:—নাহিয়ান এন্টারপ্রাইজ, মিলিনিয়াম টাওয়ার, ৪র্থ তলা, ১৫৮ এক্সেস রোড, হাজীপাড়া, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম। ই সি এম ইঞ্জিনিয়ারিং, ৬০/ডি, পুরানা পল্টন, ঢাকা। মেসার্স উৎপল এন্টারপ্রাইজ, ৩৮৫/ এ আজিজ নিবাস, পশ্চিম গোসাইভাঙ্গা, বন্দর, চট্টগ্রাম। বিটি কনস্ট্রাকশন, ০৮ নং কামাল গে ইট, পূর্ব মাদারবাড়ী, চট্টগ্রাম। নুর এ এলাহি এন্ড ব্রাদার্স (প্রাঃ) লিঃ। টেকনি ইলেকট্রিক্যালস এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ২২১ জুবলী রোড, কাদের প্লাজা ২য় তালা, চট্টগ্রাম। আবু মনি এন্টারপ্রাইজ, রোড নং-০৩, হাউজ-৯৫০, পূর্নিমা হাউজ, ও আর নিজাম রোড, চট্টগ্রাম। ই সি এম ইঞ্জিনিয়ারিং, ৬০/ডি, পুরানা পল্টন, ঢাকা। মেসার্স উৎপল এন্টারপ্রাইজ, ৩৮৫/ এ আজিজ নিবাস, পশ্চিম গোসাইভাঙ্গা, বন্দর, চট্টগ্রাম। মেসার্স ইলেকট্রো ফেয়ার, ২২১ জুবিলি রোড কাদের প্লাজা, চট্টগ্রাম। সিলিকন ফাইবার এন্ড পাওয়ার সলিউশন, ২০৭/২ ডি, মানিককদী, ঢাকা ১২০৬। মের্সাস আনিছ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ৩৭৫, মুছা সওঃ বাড়ী তুলাতুলি, পূর্ব বাকলিয়া, চট্টগ্রাম। মেসার্স কন্ট্রাকশন এক্সপ্রেস।, মেসার্স সালাউদ্দিন এন্টারপ্রাইজ। মের্সাস ওয়েস্ট ইন ইন্টারন্যাশনাল ৩৯১, সাগরিকা রোড, সরাইপারা, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম। ইউনিক কম্পিউটার এন্ড টেকনোলজি, সৌরভ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড কনস্ট্রাকশন লিঃ, সি ডব্লিউ এস (এ) প্রট-১৬ গুলশান এভিনিউ (৭ম তলা), গুলশান-১, ঢাকা-১২১২। পাওয়ার টেকনোলজি এন্ড অটোমেশন, ১৪৭/ক, মনিপুরী পাড়া ফার্মগেট, তেজগাঁও, ঢাকা-১২১৫।
ভুক্তভোগী কয়েকজন ঠিকাদার জানান, এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় এখানে কাজ পায়, আমরা পায় না, আমাদেরকে টেন্ডারেও অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। হুমকি দেওয়া হয়, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, আমরাও ঠিকাদার আমাদের তো কিছু করে খেতে হবে। এই ভাবে এই বিভাগে আমরা জিম্মি হয়ে আছি বহু বছর।
এদিকে এই ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ প্রকৌশলী তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার নিজেই, তিনি সকালের সময়কে বলেন, ঊর্ধ্বতন স্যারের কথা শুনতে হয়, সে যে ভাবে বলে সেই ভাবে কাজ করি, এখানে আমি একা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। বিল ছাড়করণে ঘুষ, কাজে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, টাকা পয়সা খাই, নিয়ম অনুযায়ী খাই, অস্বীকার করার কিছু নেই, কাজের উপর ডিফেন্ড করে কত টাকা খাওয়া যায়। স্যারদেরও একটা নিদিষ্ট কমিশন থাকে আমারও আছে। বেশি টাকা খাওয়ার দরকার পড়ে না। চলার মত হলেই হয়ে যায়।
মাধ্যমে। এসব কেনাকাটায় ৫% থেকে ১০% কমিশন দিয়ে কাজ করতে হয় ঠিকাদারদের।
আবার, যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য স্টেশন, অফিস ও অন্যান্য ইউনিটের মধ্যে দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগের জন্য অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী দেখাভালোর দায়িত্বে থাকেন। কিন্তু সম্প্রতি চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পর মতো বড় প্রকল্পের অধীনে সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন আধুনিকীকরণ (আংশিক) ও পূর্ব রেলের সংকেত বিভাগে করেছে বড় ধরনের হরিলুট, যা তারেক মোহাম্মদ শামছ্ তুষার সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে রেল সূত্রে জানা গেছে।
এই বিভাগটি বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা পূর্বাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশল দপ্তর।