নিজস্ব প্রতিবেদক ,চট্টগ্রাম।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে চাক্তাই, রাজাখালী, মেরিন ড্রাইভসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পরিবহনের মহোৎসব চলছে। স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন তথ্য বলছে, এই অবৈধ বাণিজ্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যাদের আড়ালে রয়েছে প্রশাসনের কিছু অংশ ও রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রছায়া। প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক ও ডাম্পারে করে হাজার হাজার ঘনফুট বালু পাচার হচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগরীসহ আশেপাশের জেলাগুলোতে। আর এই বাণিজ্যের আনুমানিক মূল্য দিনে কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতু, বাকলিয়া, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী অংশে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার ও ভলগেট মেশিন বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিশেষ করে চাক্তাই–রাজাখালী–মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকায় রাতের অন্ধকারে বালুবোঝাই ট্রাকের লাইন লেগে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব ট্রাকের চাপে সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ধুলোবালিতে বায়ুদূষণ তীব্র হচ্ছে এবং স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের চলাচল বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
প্রতিদিন অন্তত ১৫০–২০০টি ট্রাক সারি সারি করে চাকতাই কর্নফুলী নতুন ব্রীজ সংলগ্ন অবৈধ বালুর সেইল সেন্টার গুলোতে সন্ধ্যার পরে রমরমা বাণিজ্য বালু উত্তোলন ও চলাচল এর দৃশ্য যেকারো চোখে পড়বে।
পাশে রয়েছে নতুন ব্রীজ পুলিশ বক্স। প্রশাসন জানে, কিন্তু কিছু করে না। কারণ খোদ বাকলিয়ার
ওসি সরাসরি জডিত এবং যারা এই ব্যবসা চালায়, তাদের পেছনে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের সমর্থন রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহেদ, বাকলিয়া জানান।
আইনি কাঠামো ও লঙ্ঘন-
বাংলাদেশের ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী, নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য সরকারি ইজারা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। এছাড়া সেতু, ব্রিজ বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ১ কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু কর্ণফুলী নদীর গোডাউন সেতু, শাহ আমানত সেতুসহ একাধিক স্থাপনার কাছাকাছি প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে, যা সরাসরি আইন লঙ্ঘন।
জেলা প্রশাসনের ২০২৩ সালের ইজারার তালিকা অনুযায়ী, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া ও কর্ণফুলী উপজেলায় কোনো বৈধ বালুমহাল নেই।
তারপরও দীর্ঘ ২০–২৫ বছর ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিপত্রে উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের নেপথ্য-
অভিযোগ উঠেছে, কর্ণফুলী নদীর বালু বাণিজ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে বিরল ‘সমঝোতা’ চলছে। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে বালু মহলের নিয়ন্ত্রণও বদলায়। একসময় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের প্রভাবশালী নেতারা এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করলেও, বর্তমান সময়ে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত চক্রগুলো সক্রিয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, আয়-ব্যয়ের ৬০-৪০ ভাগ হারে ভাগাভাগি করে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ এর প্রভাবশালী নেতা মহিউদ্দিন বকুল গং এর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে অবৈধ বালু ব্যবসা।এছাড়া কর্নফুলী বালু সেইল সেন্টারের কর্মচারী ও একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না সর্তে
জানান নতুন ব্রীজ চাকতাই কর্নফুলি ডজন মামলার আসামি বালু সম্রাট সোলমানের বালু সেন্টার এ দৈনিক
২০টি ড্রেজারে প্রায় ৬০-৮০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হয়। বাকলিয়া থানার ওসি সোলেমান কে প্রতি ঘনফুটে এক টাকা হারে চাঁদা তুলে মাসে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আয় হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
শুধু একটি বালু সেন্টার থেকে মাসিক ৪৫ লাখ টাকা, এইরকম বাকলিয়া থানা এলাকায় ১৫/২০ অবৈধ বালু সেন্টার রয়েছে। শুধু অবৈধ বালুর সেইল সেন্টার থেকে বাকলিয়া থানার ওসি আয় ৫কোটি টাকার ও বেশি।
তবে বাকলিয়া থানার ওসি সোলেমান এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও নদী ভাঙন-
কর্ণফুলী নদী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী, যার মাধ্যমে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়।
কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ভাঙন তীব্র হচ্ছে, পানির প্রবাহ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম নির্বাহী পরিচালক বলেন, *”কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, স্থানীয় জনজীবন ও অবকাঠামোর জন্যও মারাত্মক হুমকি। নদীর পাড় ভাঙার কারণে শত শত পরিবার উচ্ছেদের ঝুঁকিতে আছে।”*
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীদের মতে, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নদী ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি বাড়াবে।
প্রশাসনের ভূমিকা: নীরবতা নাকি অসহযোগিতা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা বালু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। বরং কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ পাহারায় বালু উত্তোলন ও পরিবহন চলছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেন।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি বালু উত্তোলন বন্ধ না করে বরং সিন্ডিকেটকে উৎসাহিত করছেন। তবে ইউএনও এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, *”আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।”*

কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। *”যেসব প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে জেটি নির্মাণ বা বালু উত্তোলন করছে, তাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই বিষয়ে কর্নফুলী থানার ওসি জানান বর্তমান বালু উত্তোলন বন্দ রয়েছে, আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি।
তবে বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযান হয় ‘লোক দেখানো’। অভিযানের খবর আগেই সিন্ডিকেটের কাছে পৌঁছে যায়, ফলে তারা সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখে এবং অভিযান শেষে পুনরায় শুরু করে।
স্থানীয়দের দাবি ও আহ্বান –
স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা নিম্নলিখিত দাবি তুলে ধরেছেন:
✅ কর্ণফুলী নদীর পুরো এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর মনিটরিং ও ড্রোন সার্ভেইল্যান্স চালু ও সিসিটিভি ক্যামেরা সেটআপ
করা।
✅ বালু সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।
✅ প্রশাসনের জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ।
✅ নদী ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরুরি পদক্ষেপ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা।
✅ বালু পরিবহনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ও কভারড ট্রাক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
সংবাদ প্রকাশ করাই শেষ কথা নয়। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো—জনস্বার্থে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কর্ণফুলী আমাদের জাতীয় সম্পদ; এর সুরক্ষা কারো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে।”
এই প্রতিবেদন টি জনস্বার্থে ও পরিবেশ সুরক্ষায় প্রকাশিত হল। আগামী তে বালু সিন্ডিকেট চক্রের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।
সচেতন মহল ও এলাকাবাসীর দাবী
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার,
পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহ সংশিষ্ট কতৃপক্ষ দ্রুত একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে কর্ণফুলী নদীর অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
পাশাপাশি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।